কার্টুন আমাদের সন্তানদের কি ক্ষতি করছে? | Kahf Kids

কার্টুন আমাদের সন্তানদের কি ক্ষতি করছে?

Created by Jahid Hasan in Child Safety 10 Apr 2026
Share

সম্মানিত অভিভাবক, 

একবার কি গভীরভাব ভেবে দেখেছেন, আপনার আদরের সন্তানটি যখন কার্টুনের রঙিন পর্দার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুঁদ হয়ে থাকে, তখন আসলে কী ঘটছে? সে কি স্রেফ বিনোদন নিচ্ছে?


না, মোটেও না।


সে আসলে শিখছে। প্রতিটা সংলাপে, প্রতিটা অঙ্গভঙ্গিতে সে একটি জীবনদর্শন গ্রহণ করছে। তার কচি মনে গেঁথে যাচ্ছে হাজারো অদৃশ্য মূল্যবোধ। তিলে তিলে গঠিত হচ্ছে তার আগামীর চরিত্র।


এখন নিজেকে একটি কঠিন প্রশ্ন করুন, এই চারিত্রিক বীজটা বপন করছে কে? তার আদর্শ কি হওয়ার কথা ছিল কোনো কাল্পনিক সস্তা চরিত্র, নাকি ইতিহাসের সেই মহানায়কগণ? আপনার সন্তানের অবচেতন মনের কারিগর কি কোনো ভিনদেশি এনিমেশন স্টুডিও, নাকি আপনি নিজে?


🫵 একটু চোখ মেলে দেখুন: আমাদের সন্তানদের আমরা কী দিচ্ছি আর তারা কী শিখছে?


আমরা আমাদের ব্যস্ততাকে আড়াল করতে সন্তানের হাতে বিনোদনের যে ‘প্রেসক্রিপশন’ তুলে দিচ্ছি, তাতে আসলে উপকারের চেয়ে বিষক্রিয়াই বেশি ঘটছে। একটু গভীরে গিয়ে ভেবে দেখুন তো:


🌳 টারজান : বনের পশুদের মাঝে বড় হওয়া এক অর্ধনগ্ন চরিত্র। আমরা ভাবছি এটা অ্যাডভেঞ্চার, অথচ শিশুর কোমল মনে প্রথম ধাক্কাটা লাগছে তার লজ্জাবোধে। যে লজ্জা ইমানের অঙ্গ, টারজান সেই লজ্জাকেই সেকেলে বা অপ্রয়োজনীয় বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করছে। 


 🌳 সিন্ডারেলা : রাত বারোটায় বাড়ি ফেরা, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক পুরুষের সাথে নাচগান করা, একে আমরা বলছি রূপকথা! ভাবুন তো, আপনার কিশোরী মেয়েটি যখন একদিন অবলীলায় বলবে, আমি সিন্ডারেলার মত হতে চাই, সিন্ডারেলাও তো বাইরে রাত কাটিয়েছে, তাতে সমস্যা কী? আপনার কাছে কি তখন কোনো উত্তর থাকবে? আমরাই কি তাকে এই আধুনিকতার বিষ গেলাচ্ছি না?


 🌳 আলাদিন : আলাদিন একজন পেশাদার চোর, অথচ সে গল্পের হিরো! কেন? কারণ সে দেখতে সুন্দর আর রাজকুমারীকে ভালোবাসে। বার্তাটা খুব ভয়ানক, যদি তুমি সুদর্শন হও আর স্মার্ট হও, তবে তোমার অসততাও সমাজ হিরোইজম হিসেবে মেনে নিবে। তাছাড়া বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক তো আছেই। 


 🌳 ব্যাটম্যান: আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ট্রাফিক সিগন্যাল ভেঙে দুরন্ত গতিতে গাড়ি চালানো, এগুলোই ব্যাটম্যানের পরিচয়। আপনার সন্তান কি এখান থেকে শিখছে না যে, যার ক্ষমতা আছে তার জন্য দেশের আইন আলাদা? সে কি নিয়মের চেয়ে শক্তিকে বড় করে দেখতে শিখছে না?


 🌳 রোমিও-জুলিয়েট : প্রেমের ব্যর্থতায় আত্মহত্যাকে এখানে মহান হিসেবে দেখানো হয়। কৈশোরের এই সময়ে যখন আবেগ তুঙ্গে থাকে, তখন এই বিষাক্ত গল্পগুলো তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয় যে প্রেমে ব্যর্থ হলে মরে যাওয়াই শ্রেষ্ঠ পথ। একবার ভেবেছেন, কতগুলো কিশোর প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে স্রেফ এই কাল্পনিক রোমান্টিসিজমের জন্য?


 🌳 হ্যারি পটার : কোটি কোটি শিশু হ্যারি পটারের জাদুকরী দুনিয়ার ভক্ত। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশ হলো জাদুবিদ্যা কুফরি। জাদুর লাঠি দিয়ে সব সমাধান করে ফেলার এই ফ্যান্টাসি শিশুকে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পরিবর্তে এক অলীক শক্তির পেছনে ছুটতে শেখাচ্ছে।


🌳 ডোরেমন : নোবিতা একজন চরম ফাঁকিবাজ, অলস, যে পরীক্ষায় কম পায় আর মিথ্যা বলে। কিন্তু ডোরেমন তার পকেট থেকে গ্যাজেট বের করে সব মুশকিল আসান করে দেয়। আপনার সন্তান এটি দেখে শিখছে, পরিশ্রম না করলেও চলে, কোনো না কোনো শর্টকাট বা ডোরেমন ঠিকই চলে আসবে।


🌳 টম অ্যান্ড জেরি ও মটু-পাটলু : একজন আরেকজনকে মারছে, ইলেকট্রিক শট দিচ্ছে, আকাশ থেকে ফেলে দিচ্ছে সবই চলছে হাসিমুখে। শিশু যখন বাস্তবেও কাউকে আঘাত করে, সে বুঝে উঠতেই পারে না যে এটি অপরাধ। কারণ কার্টুনে সে সহিংসতাকে কমেডি হিসেবে দেখে অভ্যস্ত হয়েছে।


🌳 স্পাইডারম্যান : স্পাইডারম্যান দেয়াল বেয়ে ওঠে, বহুতল ভবন থেকে লাফ দেয়। অবুঝ শিশু যখন নিজেকে 'স্পাইডারম্যান' ভাবতে শুরু করে, তখন সে বাস্তব জীবনের বিপদকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। অনেক শিশু এই হিরো সাজতে গিয়ে ছাদ বা জানলা থেকে লাফ দিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে। এর চেয়ে বড় বিষয়, এখানে শেখানো হচ্ছে সুপারপাওয়ার থাকলেই আপনি হিরো, অথচ ইসলাম শেখায় চরিত্র আর তাকওয়াই হলো আসল সুপার পাওয়ার।


🌳 বেন টেন (Ben 10 ): একটি ঘড়ির মাধ্যমে বিভিন্ন দানব বা এলিয়েনে রূপান্তরিত হওয়া, এই ফ্যান্টাসি শিশুকে অদৃশ্য শক্তির ভুল ধারণা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এখানে এমন সব অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রদর্শন করা হয়, যা স্রষ্টার গুনাগুণের সাথে সাংঘর্ষিক। শিশু শিখছে যে, কোনো একটা যন্ত্র বা এলিয়েনই তার সমস্ত সমস্যার সমাধানকারী।


🌳 বার্বি (Barbie ): বার্বি শুধু একটা পুতুল নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল। এটি মেয়ে শিশুদের শেখায়, সুন্দর হওয়া মানেই হলো ফর্সা হওয়া, স্লিম হওয়া আর দামী দামী মেকআপ-পোশাক পরা। এই বডি শেমিং আর উপভোগবাদ (Consumerism) শৈশব থেকেই তাদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে। তারা নিজেদের স্বাভাবিক গড়ন নিয়ে অসন্তুষ্ট হতে শিখে।


🌳 সুপারম্যান : সুপারম্যানের ক্ষমতাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় যে সে অমর, সে সবকিছু করতে পারে। এই 'গড-লাইক কমপ্লেক্স' শিশুদের মনে তাওহীদি চেতনার বদলে এক ধরনের শিরকি ধ্যান-ধারণার জন্ম দেয়। তারা মনে করে দুনিয়া বাঁচাতে কোনো একজন সুপারম্যান আসবে, অথচ রিজিকদাতা এবং রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ।


আসলে তালিকার শেষ নেই। আমরা যেগুলোকে স্রেফ শৈশবের মজা বা রঙিন কার্টুন মনে করি, তার গভীরে ঢুকলে দেখা যায় সেগুলো আমাদের অজান্তেই শিশুদের মনস্তত্ত্বে এমন কিছু বীজ বুনে দিচ্ছে, যা আমাদের নৈতিকতা ও বিশ্বাসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।


🔍 আসলে দায়টা কার? 


আমরা প্রায়ই আফসোস করি, ইদানীং বাচ্চারা কথা শোনে না কেন? সারাক্ষণ জেদ করে কেন? কেন তারা এত অলস?


আমরা দোষ দিই যুগকে, দোষ দিই সমাজকে। কিন্তু কখনো কি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছি?


আসুন, একটু নির্মোহভাবে নিজেকে প্রশ্ন করি:


 ❓ট্যাবলেট কি শান্ত রাখার ওষুধ? 


যখন আপনি নিজের ফোনে স্ক্রল করতে ব্যস্ত কিংবা ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডায় মগ্ন, তখন বাচ্চা যেন বিরক্ত না করে সেজন্য আপনিই তার হাতে ডিজিটাল বিষ তুলে দিচ্ছেন। আপনি ভাবছেন সে শান্ত হয়ে আছে, আসলে তার মগজ তখন কার্টুনের রঙিন কাল্পনিক জগতে হাইজ্যাক হয়ে গেছে। আপনি তাকে সাময়িক শান্ত রাখতে গিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদী চারিত্রিক বিনাশ ডেকে আনছেন।


 ❗অজুহাত যখন ব্যস্ততা: 


সারা দিন কাজ করে ফিরি, একটু তো বিশ্রাম চাই! এই অজুহাতে আমরা কার্টুন চালিয়ে দিয়ে শিশুকে পর্দার সামনে বসিয়ে দেই। সম্মানিত অভিভাবক, আপনি যে কয়েক ঘণ্টা কার্টুনের বিনিময়ে বিশ্রাম কিনছেন, তার মূল্য হিসেবে আপনি আপনার সন্তানের নৈতিকতা আর লজ্জা বিসর্জন দিচ্ছেন। আপনি তাকে সময় দিচ্ছেন না বলেই সে পর্দার ভেতরের সেই ভিনদেশি সংস্কৃতিকে আপন করে নিচ্ছে।


 🌳 বীজ আপনি বুনেছেন, ফল তো আপনার ঘরেই উঠবে:


 কৃষক যদি কাঁটাগাছের বীজ বুনে সুমিষ্ট আমের প্রত্যাশা করে, তবে তাকে আপনি কী বলবেন? বোকামি, তাই না? আমরাও ঠিক তাই করছি। আমরা তাদের ডোরেমন দেখাচ্ছি, যেখানে ফাঁকিবাজি আর মিথ্যা বলাকে স্মার্টনেস হিসেবে দেখানো হয় আর আশা করছি সন্তান বড় হয়ে পরিশ্রমী হবে! আমরা তাদের রোমিও-জুলিয়েটের কল্পকাহিনী গেলাচ্ছি, আর আশা করছি তারা শালীন হবে!


🔍 সমস্যাটা শুধু কার্টুনে না, সমস্যা আমাদের মানসিকতায়:


আমরা শিশুকে খেলনা মনে করছি, অথচ সে এক বিশাল আমানত। আপনি যখন নিজের ঘুম কিংবা কাজের সুবিধার জন্য তাকে কার্টুনের নেশায় বুঁদ করে রাখছেন, তখন আসলে আপনি আপনার নিজের হাতেই তার ভবিষ্যতের কবর খুঁড়ছেন।


মনে রাখবেন, আজ আপনি তাকে স্ক্রিন দিয়ে শান্ত রাখছেন, কিন্তু কাল সে যখন কিশোর হবে, তখন সে আর আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। কারণ তার শিক্ষক আপনি নন, তার শিক্ষক ছিল সেই সব কাল্পনিক চরিত্র, যাদের আপনিই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছিলেন।


💡 তাহলে বাঁচার পথ কী? 


আপনি হয়তো ভাবছেন, চারদিকে যখন বিনোদনের নামে বিষাক্ত নীল আলোর হাতছানি, তখন আমাদের সন্তানদের বাঁচাবো কীভাবে? হতাশ হবেন না। একদম না। কারণ আমাদের হাতে এমন এক শক্তিশালী ভাণ্ডার আছে, যার সামনে হলিউড-বলিউডের সস্তা স্ক্রিপ্ট স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে।


আমাদের ইতিহাসে এমন কিছু রিয়েল লাইফ সুপারহিরো আছেন, যাঁদের জীবন কাহিনি যেকোনো কাল্পনিক চরিত্রের চেয়ে হাজার গুণ বেশি রোমাঞ্চকর, সাহসী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। চলুন, সেই ধুলোবালি জমা ইতিহাসের পাতাগুলো একটু ঝেড়ে দেখি:


 📜 আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ): 


আমরা আমাদের সন্তানদের সুপারম্যান বা স্পাইডারম্যানের গল্প শোনাই, কিন্তু আবু বকর (রাঃ)-এর কথা কি বলেছি? একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, অথচ আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের শেষ সম্বলটুকু পর্যন্ত বিলিয়ে দিতে যার হাত কাঁপেনি। হিজরতের সেই ভয়ংকর রাতে যখন চারদিকে শত্রু, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পাশে ছিলেন নিজের জীবনকে ঢাল বানিয়ে। এই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, এই যে অটল বিশ্বাস, কোনো কার্টুন চরিত্র কি এর ধুলিকণার সমান হতে পারবে?


 📜 উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) : 


ব্যাটম্যান আইন হাতে তুলে নেয়, আর উমর (রাঃ) আল্লাহর সন্তুষ্টির আইন প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবীর অর্ধেক শাসন করেও যার রাতে ঘুম আসত না প্রজার চিন্তায়। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে যিনি নিজের পিঠে আটার বস্তা বহন করতেন, আর রাজা হয়েও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তিনি কোনো প্রাসাদ বা অট্টালিকায় থাকতেন না। ইনসাফের এই যে মহিমা, ব্যাটম্যান কি তার এক তিলও শেখাতে পারবে?


 📜 উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) :


 বর্তমান যুগে যেখানে নির্লজ্জতাকে স্মার্টনেস বলা হয়, সেখানে উসমান (রাঃ) ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁকে দেখে আসমানের ফেরেশতারাও লজ্জা পেতেন। নিজের অঢেল সম্পদ দিয়ে মুসলিম বাহিনীকে সজ্জিত করা থেকে শুরু করে চারিত্রিক মাধুর্য, লজ্জা আর বিনয়ের এমন কোনো রূপকথা কি আপনি পৃথিবীর কোনো বইয়ে খুঁজে পাবেন?


 📜 আলি ইবনে আবি তালিব (রাঃ) : 


শিশু বয়সে ইসলাম কবুল করে যে সাহসের পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন, তা অবিশ্বাস্য। মৃত্যুর মুখামুখি হতে পারেন জেনেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিছানায় পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকলেন, যেন নবীজি নিরাপদে হিজরত করতে পারেন। এই যে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্যে মুচকি হাসা, স্পাইডারম্যান বা আয়রনম্যান কি এই কলিজা ধারণ করতে পারে?


 📜 খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) :


খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) তাঁর সামরিক জীবনে ১০০টিরও বেশি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও একটিতেও হারেননি । তিনি ইতিহাসে অপরাজেয় সেনাপতি হিসেবে পরিচিত, যিনি রোমান ও পারস্যের মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েও অপরাজিত ছিলেন । শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি ক্ষতবিক্ষত ছিল তলোয়ার আর বল্লমের আঘাতে। শেষ জীবনে যখন বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, তখন আক্ষেপ করে বলতেন, কেন ময়দানে শাহাদাত হলো না! এই যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াকু মানসিকতা, কোনো মেকি সুপারহিরো কি এই তেজ দিতে পারবে?


📜 ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ (রাঃ) : 


নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কলিজার টুকরো হয়েও যার হাতে পাথর পেষার দাগ ছিল। রাজকন্যা হয়েও যিনি ঘরের কাজ নিজের হাতে করতেন। পিতার কষ্টে যার বুক ফেটে যেত, আবার বাবার ভালোবাসায় সব দুঃখ ভুলে যেতেন। সিন্ডারেলা কি আপনার মেয়েকে বাবার প্রতি এই গভীর মমতা আর শ্রদ্ধার গল্প শেখাতে পারবে?


 📜 খাদিজা (রাঃ) : 


যখন গোটা পৃথিবী রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে পাগল বলেছে, পাথর ছুড়েছে, তখন ছায়ার মতো পাশে ছিলেন এই মহীয়সী নারী। তিনি বলেছিলেন, আমি জানি আপনি সত্যবাদী। সমস্ত সম্পদ দ্বীনের পথে অকাতরে ঢেলে দিয়েছিলেন। এই যে স্বামীভক্তি আর দুঃসময়ে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা, কোনো রোমান্টিক সিনেমা কি এই পবিত্রতার স্বাদ দিতে পারবে?


📜 লোকমান হাকিম (আঃ) : 


সন্তানকে মানুষ করার জন্য কুরআন যাঁর উপদেশকে অমর করে রেখেছে। তিনি বলেছিলেন, হে বৎস, শিরক করিও না, অহংকার করো না, সালাত কায়েম করো, সৎ কাজের আদেশ দাও, মন্দ থেকে নিষেধ করো, ধৈর্যশীল হও। একজন বাবা তাঁর সন্তানের মগজে কীভাবে নৈতিকতা বুনে দেন, তার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে?


📜 সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহঃ) : 


 যিনি বাইতুল মাকদাস পুনরুদ্ধার করেছিলেন। বিজয়ের পর তিনি শত্রুপক্ষকে এমনভাবে ক্ষমা করেছিলেন যে খ্রিষ্টান যোদ্ধারাও তাঁর সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস নয়, যুদ্ধ মানে যে মানবতা, এই বীরত্ব কি কোনো অ্যাকশন মুভি আমাদের দিতে পারবে?


📜 শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) :


 সত্য বলতে গিয়ে বারবার কারাবরণ করেছেন। অথচ জেলের ভেতরেই তিনি বলতেন, আমার শত্রু আমার কী ক্ষতি করবে? আমার জান্নাত তো আমার অন্তরে। আমায় বন্দি করা মানে আল্লাহর সাথে নির্জনে কথা বলা। যখন তাতার বাহিনী তলোয়ার হাতে আক্রমণ করেছিল, তখন এই কিতাব হাতে থাকা মানুষটিই ময়দানে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। এই যে আপসহীন এক জীবন, সুপারম্যানের তথাকথিত হিরোইজম কি এর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারবে?


📜 শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) : 


ঘড়ি মেরামতের কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল আকাশের সমান। লাইব্রেরিতে বসার জায়গা না পেয়ে মইয়ে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করেছেন। একটি একটি করে হাদিস যাচাই করেছেন সারাজীবন। জাল-যইফ হাদীস পৃথক করেছেন। ইলম অর্জনে শ্রম আর নিষ্ঠার এই গল্প কি আপনার সন্তানকে শর্টকাট খোঁজা ডোরেমন থেকে দূরে সরিয়ে পরিশ্রমি হতে সাহায্য করবে না?


📜 শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বাজ (রহঃ) : 


যৌবনকালেই তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অন্ধ চোখ নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম। হাজার হাজার মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতেন, দ্বীনের আলো ছড়াতেন। শারীরিক অক্ষমতা যে সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না, এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? স্টিফেন হকিং-এর গল্প শোনানোর আগে বিন বাজদের এই ঈমানদীপ্ত লড়াই কি আমাদের সন্তানদের জানানো উচিত ছিল না?


সম্মানিত অভিভাবক, একবার ভাবুন তো, একটা কাঁচা মাটির দলাকে যেভাবে আকার দিবেন, সেভাবেই কি সে শুকিয়ে শক্ত হবে না? আপনার সন্তানের মনটা ঠিক সেই কাদার তাল। আপনি যখন তাকে কার্টুনের রঙিন, কাল্পনিক আর অদ্ভুতুড়ে এক অন্ধকার জগতের সামনে বসিয়ে দিচ্ছেন, তখন সেই কাদার তালে আপনি এক বিষাক্ত ছাঁচ তৈরি করছেন।


সত্যিই মুসলিম অভিভাবকদের সময় এসেছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার। আপনার সন্তান এখন যা দেখছে, যা পড়ছে, যা শুনছে, তাই দিয়েই তার আগামীর মেরুদণ্ড তৈরি হচ্ছে।


 আজকের ডোরেমন-পাগল শিশুটি যখন বাস্তবে কোনো সংকটে পড়বে, সে পরিশ্রম করতে ভুলে যাবে। সে খুঁজবে কোনো ম্যাজিক গ্যাজেট। কিন্তু জীবন তো গ্যাজেটে চলে না, জীবন চলে ঘাম আর শ্রমে।


 যে কিশোর আজ আত্মহত্যার রোমান্টিসিজম পড়ছে, কাল প্রেমে একটু ব্যর্থ হলে তার মাথায় জীবন দেওয়ার চিন্তা আসা কি খুব অস্বাভাবিক?


 যে শিশু দেখছে চোর হয়েও আলাদিন হিরো, সে কাল যখন বড় হবে, তার কাছে লক্ষ্য অর্জনে যেকোনো পথ বৈধ মনে হতে শুরু করবে। সততা তখন তার কাছে স্রেফ একটা ব্যাকরণ বইয়ের সংজ্ঞা হয়ে থাকবে।


কিন্তু ভাবুন তো, দৃশ্যপট যদি এমন হতো, আপনার সন্তান রাতে ঘুমানোর আগে উমর (রাঃ)-এর ইনসাফের গল্প শুনছে। সে শিখছে, কীভাবে অর্ধ-পৃথিবীর শাসক হয়েও সাধারণ মানুষের কষ্টে রাজা কাঁদেন। সে কাল বড় হয়ে যখন কোনো দায়িত্ব পাবে, সে কি সৎ হতে দুবার ভাববে? অবশ্যই না।


যদি সে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-এর বীরত্বের কথা শোনে, তার রক্তে তখন বইবে সাহসিকতার নেশা। সে কাল অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে না, বরং মাথা তুলে দাঁড়াবে।


যদি সে ফাতিমা (রাঃ)-এর পিতৃভক্তির গল্প শোনে, যদি সে জানে জান্নাতের সর্দারনী হয়েও তিনি কতটা বিনয়ী আর সেবাপরায়ণ ছিলেন, তবে কি সে আপনার বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেবে? কক্ষনো না। সে হবে আপনার বার্ধক্যের শীতল ছায়া।


যদি সে ইমাম বুখারী (রাঃ)-এর একনিষ্ঠতা কিংবা ইবনে তাইমিয়া (রাঃ)-এর আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস জানে, তবে প্রতিকূলতা তাকে দমাতে পারবে না। সে হবে আগামীর এক অপরাজেয় সিপাহসালার।


সিদ্ধান্তটা আপনার, এখনই!


সম্মানিত অভিভাবক, আপনার সন্তানের শৈশবের সেই স্ক্রিন টাইম আসলে তার ভবিষ্যৎ গঠনের ক্রুশিয়াল টাইম। তাদের কানে কানে শোনান, বাবা, তোমার শেকড় অনেক শক্ত, তোমার ইতিহাস অনেক গৌরবের। তুমি কোনো ভিনদেশি কার্টুন চরিত্রের উত্তরসূরি নও, তুমি হলে সেই সব মহামানবদের উত্তরসূরি যাঁদের পায়ের ধুলোয় কেঁপে উঠত বড় বড় সাম্রাজ্য।


বীজটা আপনার হাতে। এই ছোট হাতগুলো দিয়ে আপনি কি কালকের উমর গড়বেন, নাকি স্রেফ একজন অবাস্তব সুপারম্যান? ফসলটা আপনার ঘরেই উঠবে। আপনার সন্তানই হয় আপনার জন্য সদকায়ে জারিয়া হবে, নয়তো আফসোসের কারণ। 


তাই আজই সিদ্ধান্ত নিন, আপনার সন্তানের মন কার হাতে গড়বেন? কার্টুনের কাল্পনিক চরিত্রের হাতে, নাকি ইতিহাসের সত্যিকারের সেই অমর নক্ষত্রদের হাতে?


পরিশেষে দুআ করছি: 

হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।

হে আমার পালনকর্তা, আমাকে এবং আমার সন্তানদের সালাত কায়েমকারী করুন। 


আল্লাহ আমাদের সন্তানদের রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শে গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন (আমিন)

Comments (0)

Share

Share this post with others

GDPR

When you visit any of our websites, it may store or retrieve information on your browser, mostly in the form of cookies. This information might be about you, your preferences or your device and is mostly used to make the site work as you expect it to. The information does not usually directly identify you, but it can give you a more personalized web experience. Because we respect your right to privacy, you can choose not to allow some types of cookies. Click on the different category headings to find out more and manage your preferences. Please note, that blocking some types of cookies may impact your experience of the site and the services we are able to offer.